আমবুড়ো - পর্ব - ১১ - শম্পা সাহা

 



আমবুড়ো - পর্ব - ১১

শম্পা সাহা
(প্রাপ্তমনস্কদের জন্য)
আমবুড়ো তারপর থেকে আর কোনোদিন ক্লাবে যায় না। ঘরে জল ঢুকলে মা-বাবার সঙ্গে ওই চৌকিতেই গুটিসুটি মেরে বসে থাকে তবুও দাদার সঙ্গে ক্লাবে শুতে যায় না। শেফালী মামী মাঝে মাঝে মুখ টিপে হাসে
-এই বুড়ো দাদার সঙ্গে কেলাবে যা না। এইটুকু চৌকিতে কি আর তিনজনের হয়?
কিন্তু কিছুতেই ও রাজি হয় না। মরে গেলেও কোনদিন ও আর গিয়ে পড়বে না জগা সজলের পাল্লায়!
ও গুঁজিমুজি হয়ে চৌকির ওপর দেয়ালের কোণটাতে যতটা কম পারা যায় জায়গা নিয়ে বসে থাকে, মা-বাবার শোয়ার জায়গা করে দিয়ে‌। এইসব পরিস্থিতি এড়াতে ওরা যখন নিজেদের বাড়ির জন্য, জমিতে মাটি ফেলছে, তখন ওই নিচু জমিতে মাটি ফেলতে বেশ কিছুটা টাকা খরচ হয়ে গেল ।সেটা তো আবার আগের অবস্থায় আনতে হবে?
তাই তোড়জোড় রোজগারের ।এই সময় একদিন আমবুড়ো কিছুতেই কাজে যাবে না! যে ছেলে কাজে না যাবার কথা ভাবতেই পারেনা, তার কি এমন হলো? আসলে বেচারার দুই বগলে ফোঁড়া, হাত তুলতেই পারছে না ।তবুও কাজ করেছে ওই ফোঁড়া নিয়েই ।কিন্তু কাল রাত থেকে ওই ফোঁড়ার যন্ত্রণায় ধুম জ্বর। সকালে বিছানা থেকে উঠতেই পারে নি ।যে রোজ আটটার মধ্যে স্থান টান সেরে, টিফিন কৌটো নিয়ে কারখানায় দৌঁড়ায়, সে আজও তখনো শুয়ে!
শেফালী মামী হঠাৎই তারস্বরে চেঁচায়, সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে
-ও বুড়ো আজ আর কাজে যাইতে হইবো না ।গায়ে এতো জ্বর !না হয় পঞ্চাশটা টাকা মার যাইবো। তা যাউক! তোর এত জ্বর ! তুই আজকা শুইয়াই থাক!
বুড়োর এতক্ষণ জ্বরটাই মাথায় ছিল টাকার অংকটা নয়। পঞ্চাশ টাকার অংকটা যেন ওর মস্তিষ্কে এক অদ্ভুত রসায়নের ক্ষরণ শুরু করল ।ও তড়াক করে উঠে, খালি গায়ে কোন রকমে প্যান্টটা গলিয়ে শার্ট পিঠের ওপর ফেলে চলল কাজে।
জামা পরবে কি করে? বগলে তো প্রচন্ড ব্যথা!ফোঁড়াগুলো যে পেকে পুঁজ গড়াচ্ছে !ওকে বের হতে দেখে শেফালী মামী মুচকি হাসে! ও যখন গেটের মুখে ,মামীর চিৎকার
-কি রে ,বাসি মুখেই গেলি ।খেয়ে গেলি না?
– দুপুরে এসে খাবো
আমবুড়ো দৌড় দিল হাতদুটো কিছুটা উপরের দিকে আলগা করে রেখে ,যাতে বগলে চাপ না পড়ে।
সুভাষ গ্রামে বাড়ি তৈরি হতেও সময় লাগলো না। একটা ঘর, প্লাস্টার ছাড়া একটা পায়খানা, বাথরুম, লাগোয়া কলপাড়, সামান্য উঠোন, মুলিবাঁশের বেড়া। তাতেই ওরা উঠে চলে গেল, বারো ঘর এক উঠোনের এই বস্তি ছেড়ে।
ওটাও বস্তি বই আর কিছু না। গায়ে গায়ে লাগোয়া বাড়ি।এলাকার বেশিরভাগ লোকই কারখানায় কাজ করে, মেয়ে পুরুষ নির্বিশেষে। তবু তো নিজের ।জামাকাপড় মেলা নিয়ে, জল তোলা নিয়ে, উঠোন ঝাঁট নিয়ে প্রতিনিয়ত আর এর ওর সঙ্গে লড়াই ঝগড়া করতে হবেনা।
শেফালী মামীরা বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও ঘরটা কিন্তু ছাড়লো না। আমবুড়ো, শান্তি মামা,হারু তিনজনকেই তো কাজ করতে কলকাতাতেই আসতে হবে ।যদি কোনদিন ট্রেন গন্ডগোল হয় বা ঝড় বৃষ্টির কারণে বাড়ি ফিরতে না পারে ? এ ব্যাপারে ওরা বেশ দূরদর্শিতার পরিচয় দিল।
শেফালী মামী যেদিন থেকে নিজের বাড়ী হয়েছে সেইদিন থেকেই এইসব ভাড়াটেদের আর নিজের সমগোত্রীয় ভাবে না ।তাই যাওয়ার সময় কাউকে বলে যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করলো না। আসলে যারা ভাড়ার বাড়িতে থেকেছে বা যারা নিজের বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতে জীবনের কোন না কোন সময় বাধ্য হয়েছে, তারা জানে যে সেটা কতটা কষ্টকর ! তার ওপরে বারো ঘর এক উঠোনগুলো তো আরো অসহ্য!
এক তো বাড়িওয়ালা টিকির টিকির করে! তারপরে আবার তেমন ভাড়াটে যদি কেউ থাকে, তারও তাবেদারী করতে হয় ! না হলে অশান্তি! কোনো না কোনো কারণে তো এর ওর সাথে খিটিমিটি লেগেই আছে! তাই নিজের বাড়ির স্বপ্নটা পূরণ হতে শেফালী মামী যেন হাতে চাঁদ পেল।
আমবুড়ো ভোরবেলা উঠে কোনরকমে সকালের চাটা খেয়েই রওনা দেয় কলকাতার দিকে,সঙ্গে পুঁটুলিতে বেশিরভাগ দিনই ভাত,ডাল,আলুসেদ্ধ। ঠিক সাড়ে আটটায় হাজিরা ‌।তার কোনো ব্যত্যয় নেই কখনো!
এর মধ্যে ওর জমানো টাকা প্রায় শেষ! যদিও ব্যাগে ওই একই রকম নোটের বান্ডিল , কিন্তু ওর সঞ্চয়ে যে ঘাটতি! ওর মাথায় টাকার নেশা আরো বেশি করে চাগিয়ে ওঠে !মালিককে বলে কয়ে একটা রিক্সা নেয়।টাকাটা মালিকের থেকে ধার নিয়েছে মাসে মাসে মায়না থেকে কাটাবে কিছু কিছু করে ।
রোজ কারখানা ছুটি হলে ,ভাড়াবাড়ির ঘরে এসে বাপ ছেলেতে চা খেয়ে, মামা বাড়ি চলে যায় আর আমবুড়ো রাত দশটা পর্যন্ত রিকশা টেনে বাড়ি যায় সেই লাস্ট ট্রেনে।
ওর বাঁধা সওয়ারী পেতে খুব একটা অসুবিধা হলো না ।কারণ ওকে যা খুশি ভাড়া দেওয়া যায় ।ও কখনো ভাড়া নিয়ে গন্ডগোল করে না। আর যা দেওয়া যায় তাতেই খুশি ।শুধু কাজ দিলেই হবে ‌।মাল বইতে বইতে এমনকি লোকজন নিয়ে যেতে যেতেও ও নিজের মনেই কথা বলে। বন্ধু বান্ধবও আর তেমন নেই ।শুধু নিজের কাজ আর টাকার নেশা ! যেন পাগল!
গায়ে এক পরত মাটি, খালি গা,পরনে একটা নোংরা পুরনো ফুলপ্যান্ট, তার আবার নিচের দিকটা ছেঁড়া, মাথায় তেল নেই ।তাতে ওর কোনো হুঁশ নেই ! হাজার টাকা দিয়ে একটা মোবাইল কিনেছে যাতে সারাদিন গান চলে আর আমবুড়ো কাজ করে যায় নিজের মনে ।ওকে আর কোন অন্যরকম কাজকর্ম করতে দেখা যায়নি। ওর কোনো নেশাও নেই। না বিড়ি, না মদ, না অন্য কিছু।শুধু মাঝে মাঝে একটু সময় করে, চানাচুর কিনে সেই ছোটবেলার মতোই যত্ন করে প্রতিটা কাঠি, বাদাম, চিঁড়ে ভাজা, একটা একটা করে মুখে ফেলে’ পরম তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করে চিবোয়, পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে। আসলে বোধহয় ছোটবেলায় পয়সার অভাবে যা ও পায়নি বলে মনে করে তার সবই পেতে চেষ্টা করে তার মধ্যে খাবার জিনিসই প্রধান!
ক্রমশ…

Post a Comment

0 Comments